নির্বাচনের ঠিক আগে তড়িঘড়ি: বেসরকারি খাতে রিফাইনারি ও জ্বালানি তেল আমদানির অনুমোদনের তোড়জোড়
- আপডেট সময় ১২:২১:০৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / ৩২ বার পড়া হয়েছে
নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে গ্যাস ও তরল জ্বালানি বা এলপিজি নিয়ে চলমান সংকটের মধ্যেই বেসরকারি খাতে তরল জ্বালানির রিফাইনারি (পরিশোধনাগার) স্থাপনের অনুমোদন দিতে তড়িঘড়ি শুরু করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও জ্বালানি বিভাগ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে, একটি নির্দিষ্ট শিল্পগোষ্ঠীকে সুবিধা দিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জ্বালানি উপদেষ্টার পূর্ববর্তী বক্তব্যের সঙ্গে বর্তমান কার্যক্রমের অসামঞ্জস্যতা এবং বোর্ড সভার তারিখ পরিবর্তন করে জরুরি বৈঠক ডাকার ঘটনায় খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সন্দেহের দানা বেঁধেছে।
উপদেষ্টার ‘ইউ-টার্ন’ ও নীতিগত অসামঞ্জস্যতা
মাত্র ছয় মাস আগেই সরকারের অবস্থান ছিল ভিন্ন। গত ২০২৫ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামে বিপিসির এক অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা স্পষ্ট জানিয়ে ছিলেন, বাংলাদেশে বেসরকারি রিফাইনারি স্থাপনের সুযোগ দেওয়া হলে তা কোনো একক প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হবে না; বরং প্রক্রিয়াটি হবে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত।
কিন্তু নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে জ্বালানি বিভাগ। অভিযোগ উঠেছে, উন্মুক্ত প্রক্রিয়ার পরিবর্তে চট্টগ্রামকেন্দ্রিক একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে জ্বালানি তেল আমদানি ও রিফাইনারি স্থাপনের অনুমোদন দেওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হচ্ছে।
সন্দেহের কেন্দ্রবিন্দুতে জরুরি ‘জুম মিটিং’
বিপিসির দাপ্তরিক কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জানা যায়, গত ৯ ফেব্রুয়ারি বিপিসির ১০১৭তম বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, যেখানে এজেন্ডা হিসেবে রিফাইনারির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, নির্ধারিত তারিখের একদিন আগে অর্থাৎ ৮ ফেব্রুয়ারি বিকেলে জুম প্ল্যাটফর্মে তড়িঘড়ি করে একটি জরুরি সভা ডাকে বিপিসি। এত তাড়াহুড়ো করে এই নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াই সন্দেহের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠান ও আবেদনের প্রেক্ষাপট
সূত্রমতে, চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠী টিকে গ্রুপ-এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ‘সুপার পেট্রোকেমিক্যাল লিমিটেড (এসপিএল)’, যা বর্তমানে এসপি পিএলসি নামে পরিচিত, এই অনুমোদনের জন্য অপেক্ষমাণ।
প্রেক্ষাপট: ২০২৩ সালে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ‘বেসরকারি জ্বালানি নীতিমালা-২০২৩’ প্রণয়ন করেছিল, যার লক্ষ্য ছিল একটি বড় শিল্পগ্রুপকে (সম্ভাব্য এস আলম গ্রুপ) সুবিধা দেওয়া। তবে শেষ পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি।
বর্তমান আবেদন: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর, ২৫ সেপ্টেম্বর এসপি পিএলসি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুত ও বিপণনের জন্য আবেদন করে।
অস্বচ্ছ প্রস্তাবনা: আবেদনে প্রায় সাড়ে ১৫ লাখ টন পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার কথা বলা হলেও, এতে বিনিয়োগের কোনো আর্থিক তথ্য বা সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেওয়া হয়নি।
দায়সারা প্রতিবেদন ও বিপিসির ভূমিকা
এসপি পিএলসি-এর আবেদনের প্রেক্ষিতে গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর জ্বালানি বিভাগ বিপিসির মতামত চায়। এ নিয়ে বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (বণ্টন ও বিপণন) মো. জাহিদ হোসাইনকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল প্রতিবেদন জমা দেয়। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রতিবেদনটি ছিল অত্যন্ত দায়সারা এবং সেখানে প্রস্তাবিত প্রকল্পের আর্থিক বিনিয়োগ সংক্রান্ত কোনো বিশ্লেষণ বা তথ্য ছিল না।
বিশেষজ্ঞ মতামত: ‘দেশ অসাধু ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে’
নির্বাচনের আগে এমন হঠকারী সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:
“মীরজাফর ব্রিটিশদের হাতে দেশ তুলে দিয়েছিল। এখন এরা বেসরকারি অসাধু ব্যবসায়ীদের হাতে দেশ তুলে দিচ্ছে। আগে আওয়ামী লীগ সরকার ইআরএল-২ এস আলমের হাতে তুলে দিয়েছিল। এখন একই কাজ করা হচ্ছে, তবে লোক আলাদা। এটাতে আমার প্রতিবাদের ভাষা নেই।”






















